বৃহস্পতিবার, ২৫ Jun ২০২৬, ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন
চলচ্চিত্রের সোনালি সময় হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। নানা কারণে ধস নেমেছে চলচ্চিত্রশিল্পে। প্রায় দেড় হাজার সিনেমা হল কমতে কমতে এখন এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধশত’তে। আগের মতো এখনকার সিনেমা যেমন দর্শক টানছে না, তেমনই অনেক সিনেমা মুক্তিকালে প্রেক্ষাগৃহও পাচ্ছে না। হল না পাওয়ায় আলোচিত অনেক সিনেমা প্রদর্শিত হচ্ছে বিকল্প পথে। দিন দিন এর প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন প্রযোজক-পরিচালকরা। অনেক সিনেমাই প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে না পারলেও বিকল্প প্রদর্শনীতে সাড়া ফেলছে।
কিছুদিন ধরেই বেশ কিছু সিনেমা মুক্তি দেওয়ার আগে এর পরিচালক-প্রযোজকরা বিকল্প ব্যবস্থায় সিনেমা প্রদর্শনের চিন্তা করেছেন। এর মধ্যে বিকল্পধারা ও অনুদানের সিনেমার সংখ্যাই বেশি।
জানা গেছে সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘৭১ সেইসব দিনগুলি’ সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগেই বিকল্প প্রদর্শনী নিয়ে চেষ্টা করছেন এর নির্মাতা হৃদি হক। দেশের প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে এর প্রদর্শনী নিয়ে চিন্তা করছেন তিনি। এই ব্যবস্থায় সাড়া ফেলেছে চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমা ‘সাঁতাও’।
গণঅর্থায়নে নির্মিত এ সিনেমাটি গত ২৭ জানুয়ারি মাত্র পাঁচটি হলে মুক্তি পায়। প্রেক্ষাগৃহে তেমন একটা না চললেও বিকল্প প্রদর্শনীতে দর্শক টেনেছে প্রচুর। বিভিন্ন জেলা শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রদর্শনী হয় সিনেমাটি। একের পর এক বিকল্প প্রদর্শনীর আমন্ত্রণ পান নির্মাতা খন্দকার সুমন।
হলের চেয়ে বিকল্প প্রদর্শনী বেশি লাভজনক বলে মন্তব্য করেন ‘সাঁতাও’ পরিচালক সুমন। তিনি বলেন, ‘ছবিটি মাত্র দুই সপ্তাহ হলে চলেছে। কোনো কোনো হল প্রথম সপ্তাহেই নামিয়ে দিয়েছে। পরে আমরা বিকল্প পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী করে দারুণ দর্শক সাড়া পেয়েছি।’ তিনি জানান, বিকল্প পদ্ধতিতে প্রথমে টিএসসিতে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে আট শতাধিক দর্শক হাজির হয়। পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলা শহরে প্রদর্শনীতে দর্শক উপচে পড়েন।’ পরিচালক বলেন, ‘এমন দর্শকও পেয়েছি যাদের বয়স ২৫-৩০ বছর। অথচ তারা কখনো হলে গিয়ে সিনেমা দেখেননি।
বিকল্প প্রদর্শনীতে সাঁতাও দেখতে এসেছেন।’ উজানের বাঁধে মরুভূমিতে রূপ নেওয়া ভাটি অঞ্চলের কৃষকের হাত-পা বাঁধা প্রকৃতি আর এলাকার প্রভাবশালীদের কাছে। সেসব কৃষকের যাপিত জীবনের যন্ত্রণা আর সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘সাঁতাও’। এর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আইনুন পুতুল, ফজলুল হক ও আব্দুল্লাহ আল সেন্টুসহ অনেকে।
সিনেমাটি ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরমা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে প্রশংসিত হয়। গত বছরের আলোচিত সিনেমা ‘গলুই’। শাকিব খান-পুজা চেরী অভিনীত এই সিনেমার বেশিরভাগ শুটিং হয়েছিল জামালপুর জেলায়। ফলে সেখানকার মানুষের আগ্রহ ছিল সিনেমাটি নিয়ে। অথচ এই জেলায় মেলান্দহ উপজেলার আশা সিনেমা হল ছাড়া অন্য কোনো সিনেমা হল নেই।
বাধ্য হয়ে ‘গলুই’ সংশ্লিষ্টরা জেলা শিল্পকলাসহ তিনটি মিলনায়তনে ঈদের দিন থেকে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। এসব মিলনায়তনে দর্শকেরও উপস্থিতি ছিল উপচেপড়া। গত বছরের ঈদের আরেক সিনেমা ‘শান’। পার্বত্য জেলাগুলোর অনেক স্থানে পেক্ষাগৃহ না থাকার কারণে বিকল্প ব্যবস্থায় সিনেমাটির প্রদর্শনী হয়। রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে দেখানো হয় সিনেমাটি। এম এ রহিম পরিচালিত এ সিনেমায় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাসকিন রহমান, সৈয়দ হাসান ইমাম, চম্পা, অরুণা বিশ্বাস প্রমুখ।
২০১৯ সালে মুক্তি পায় হাবিবুল ইসলাম হাবিবের প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাত্রীর যাত্রী’। আনিসুর রহমান মিলন, মৌসুমী জুটির এই সিনেমাটি ২১টি হলে আলোর মুখ দেখে। এই সিনেমাটিও বিকল্প ব্যবস্থায় প্রদর্শনী হয় বিভিন্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দর্শক সাড়াও ছিল ভালো। পরিচালক হাবিব বলেন, ‘শুরু থেকেই সিনেমাটি প্রচারে বেশ এগিয়ে ছিল। জেলায় জেলায় এর ফ্যান গ্রুপ ছিল। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর আমরা সিনেমাটি বিকল্প পন্থায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করি। মোটামুটি সাড়াও ভালো ছিল। এরপর করোনা আসাতে আমরা আর সামনে আগাতে পারিনি।’
কারুকাজ ফিল্মসের প্রথম চলচ্চিত্র ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’। রিয়াজুল রিজু পরিচালিত এ সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ৮টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিনেমাটি সারা দেশের ৪২টি হলে মুক্তি পেলেও অদৃশ্য কারণে প্রথমদিনই ৩৮টি প্রেক্ষাগৃহ থেকে হল থেকে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই চলচ্চিত্রটি নেমে যায়। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই নেমে যায় বাকি হল থেকে। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিকল্প পদ্ধতিতে চলে এর প্রদর্শনী। চলচ্চিত্রটির গল্পে দেখা যায়, যমুনা পাড়ের চর ‘চর ভাগিনা’। চরের মালিক জীবন সরকার আর প্রান্তিক চাষি হাসেন মোল্লাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে কাহিনী। ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ ছবিতে অভিনয় করেছেন শহীদুজ্জামান সেলিম, শতাব্দী ওয়াদুদ, সানজিদা তন্ময়, মাসুদ মহিউদ্দিন, হাফসা মৌটুসী, তারেক বাবু প্রমুখ। অনন্ত আজাদ পরিচালিত প্রথম সিনেমা ‘আহত ফুলের গল্প’। আর্থিক সংকট আর বিশৃঙ্খল ডিস্ট্রিবিউশনের কারণে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগেই বিকল্প ব্যবস্থায় প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি। সিনেমাটি পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থানায় প্রথম প্রদর্শিত হয়। এরপর রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি, বগুড়া শিল্পকলা একাডেমি, জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ নওগাঁয় প্রদর্শিত হয় ‘আহত ফুলের গল্প’। ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিজস্ব অর্থায়নে সিনেমাটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন অনন্ত আজাদ। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাহিয়া তাজিন খান ও সুজন মাহাবুব।
প্রেক্ষাগৃহে দর্শক না টানলেও বিকল্প ব্যবস্থায় সাড়া ফেলে রেদওয়ান রনির ‘আইসক্রিম’। কক্সবাজার, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় টিকিটের বিনিময়ে দেখার সুযোগ পায় দর্শক। ‘আইসক্রিম’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন নবাগত উদয়, রাজ ও তুষি। আরও আছেন ওমর সানী, দিতি, এ টি এম শামসুজ্জামান প্রমুখ।